Sunday, 24 September 2017
ইভেন্ট হেডলাইন
×

Warning

Error loading component: com_languages, Component not found.

দুবলার চর ও রাসমেলা

0
0
0
s2smodern
powered by social2s

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ম্যানগ্রোভ’ সুন্দরবন। এই সাগরস্নাত গহীন জঙ্গল  সুন্দরবনের মধ্যে অপূর্ব সৌন্দর্যমন্ডিত একটি স্থানের নাম দুবলারচর। ধু-ধু বালুকাময় এই চর সংলগ্ন বনে শত শত চিত্রা হরিণের অবাধ বিচরণ এবং অন্যদিকে সমুদ্রের তরঙ্গমালার হাতছানি যে কোন পর্যটককে বিমুগ্ধ ও আনমনা করে তোলো। বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন-এ দুবলার চর। এটির অবস্থান মংলা সমুদ্র বন্দর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের দক্ষিণে, সমুদ্রের কোল ঘেঁষে। দুবলার চর সুন্দরবনের ৪৫ এবং ৮ নম্বর কম্পার্টমেন্টে অবস্থিত। এই চরের মোট আয়তন ৮১ বর্গমাইল, আলোরকোল, কোকিলমনি, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া,

ছোট আমবাড়িয়া, মেহের আলির চর এবং শেলার চর নিয়ে এই দুবলার চর গঠিত। সুন্দরবনের এই দুবলারচরটি বিভিন্ন কারণে খ্যাতি লাভ করেছে। শীত মৌসুমের শুরুতে হাজার হাজার জেলে দলে দলে এই চরে মাছ ধরতে এসে অস্থায়ী আবাস গড়ে তোলে। জেলেরা দিনভর সাগরে মাছ ধরে সন্ধ্যার আগেই তারা ফিরে আসে। চরে মাছ শুকিয়ে তারা শুঁটকি মাছ তৈরি করে। এ দৃশ্য অত্যন্ত উপভোগযোগ্য।  তবে দুবলার চরের ব্যাপক পরিচিতি দিয়েছে একটি উৎসব যা প্রায় ১০০ বছর ধরে  প্রতি বছর নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে তা হলো ‘রাসমেলা’।

রাসমেলা মনিপুরিদের প্রধান উৎসব, এটি রাসলীলা নামেও পরিচিত। রাসমেলার প্রধান দিক হলো চিরাচরিত মনিপুরি পোশাকে শিশুদের রাখাল নাচ ও তরুণীদের রাসনৃত্য। মনিপুরি সংগীত ও নৃত্যনাট্যের মাধ্যমে কৃষ্ণ-অভিসার রাধা-গোপী অভিসার-রাগ আলাপন ইত্যাদি অভিনীত হয়। কেউ কেউ আবার এ মেলাকে মগদের মেলা বলে থাকেন। মূলত হিন্দু পৌরানিক মতে রাস হচ্ছে রাধা-কৃষ্ণের মিলন।

তবে দুবলার চরে এ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ হতে। ১৯২৩খ্রিস্টাব্দে হরিচাঁদ ঠাকুরের এক বনবাসী ভক্ত, নাম হরিভজন (১৮২৯—১৯২৩), যিনি প্রায় ২৫ বছর এই বনেরই ফলমূল খেয়ে জীবন ধারণ করেছিলেন তিনি তার গুরুর নির্দেশে এই মেলা চালু করেন। কথিত আছে যে, তার গুরু হরিচাঁদ ঠাকুর এই মেলা চালুর জন্য স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়ে তার শিষ্যকে তা চালুর আদেশ দেন।  প্রতি বছর বাংলা কার্তিক এবং ইংরেজী নভেম্বর মাসের রাস পূর্ণিমা তিথিতে পুন্যস্নানের উদ্দেশ্যে অসংখ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুবলার চরে আসেন। বাংলা কার্তিক বা ইংরেজি নভেম্বর মাস ঠিক থাকলেও পূর্ণিমার সাথে সংশ্লিষ্ট বলে এ মেলার তারিখ পরিবর্তিত হয় প্রতিবছরই। এবছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে এ মেলা অনুষ্ঠিত হবে ২৪-২৬ নভেম্বর। রাসমেলায় বহু দূ্র-দূরান্ত থেকে নৌকা, ট্রলার ও লঞ্চ যোগে স্থানীয় লোকজন ছাড়াও দূর-দূরান্তের হাজার হাজার শহরবাসী এমনকি বিদেশি পর্যটকেরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে থাকেন। হিন্দু শাস্ত্র মতে, দু্বলারচরে রাসমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সারারাত স্রষ্টার নাম স্মরণ করা এবং নৃত্য, বাদ্য ও গীত চলে। সকালে সবাই বের হন সমুদ্র স্নানে। দুবলার চরে সূর্যোদয় দেখে ভক্তরা সমুদ্রের জলে ফুল ও ফল ভাসিয়ে দেন। কেউবা আবার বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ভজন-কীর্তন গেয়ে মুখরিত করেন চারপাশ। অনেকে সাগরকে সামনে নিয়ে নির্জনে কৃষ্ণপূজার সঙ্গে দেবতা নীল কমল আর গঙ্গাদেবীর আরাধনায় নিমগ্ন হন। পাপমোচন করেন সমুদ্রস্নানে। পূজা-অর্চনার ফাঁকে সূর্যাস্তের পর সাগরকে সাক্ষী করে আকাশের বুকে উড়িয়ে দেয়া হয় ফানুস।

রাস মেলা উপলক্ষে বন বিভাগ ৮টি পথ নির্ধারণ করেছে। সেগুলো হলো বুড়িগোয়ালিনী, কোবাদক থেকে বাটুলানদী-বলনদী-পাটকোষ্টা হংসরাজ নদী হয়ে দুবলারচর। কদমতলা হতে ইছামতি নদী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কৈখালী স্টেশন হয়ে মাদারগাং, খোপড়াখালী ভাড়ানী, দোবেকী হয়ে আড়পাঙ্গাসিয়া-কাগাদোবেকী হয়ে দুবলার চর। কয়রা, কাশিয়াবাদ, খাসিটানা, বজবজা হয়ে আড়ুয়া শিবসা-শিবসা নদী-মরজাত হয়ে দুবলার চর। নলিয়ান স্টেশন হয়ে শিবসা-মরজাত নদী হয়ে দুবলার চর। ঢাংমারী/চাঁদপাই স্টেশন হয়ে পশুর নদী দিয়ে দুবলারচর, বগী-বলেশ্বর-সুপতি স্টেশন-কচিখালী-শেলার চর হয়ে দুবলার চর। 

রাসমেলা উদ্যাপন কমিটির চেয়ারম্যান মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগর কূলে সুন্দরবনের দুবলার চরে আলোর কোলে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। অতীতে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই উত্সবে যোগ দিলেও কালের বিবর্তনে এখন তা নানা ধর্ম-বর্ণের লোকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। জিয়াউদ্দিন জানান, আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে এবার বেশ জমজমাটভাবে মেলা উদ্যাপনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মংলাসহ সুন্দরবনের ৮টি পয়েন্ট দিয়ে রাসমেলায় প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। রাসমেলা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন ও এর নিরাপত্তায় বন বিভাগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দর্শনার্থী ও তীর্থযাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তাসহ হরিণ শিকার রোধে বনরক্ষীদের পাশাপাশি মেলায় এবারও র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল থাকবে। মেলায় চোরা শিকারিদের রুখতে সব ধরনের দর্শনার্থীর অগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।  -রহীম সর্‌ওয়ার